দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিক ও মেরিনদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কয়েকজন নাবিক সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দুটি বিশেষায়িত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নৌবাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন নিয়ে রণতরীটি টানা নবম মাস সমুদ্রে রয়েছে। আধুনিক সময়ে কোনো বিমানবাহী রণতরীর জন্য এটি রেকর্ডসংখ্যক সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থানের ঘটনা। এর মধ্যে টানা ২৫০ দিন কোনো স্থলভাগে না থেমে সমুদ্রে ছিল রণতরীটি।
গত বৃহস্পতিবার সান দিয়েগোতে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক আবেগঘন বৈঠকে রণতরীতে থাকা স্বজনদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রায় ২০০ পরিবারের সদস্য। সেখানে এক নারী জানান, তার স্বামী ওই দিন তাকে বার্তা পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘তিনি আশা করছেন, আগামীকাল যেন ঘুম থেকে না ওঠেন।’
বৈঠকে নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এক নারী হাং কাওকে বলেন, নৌবাহিনী ও নেতৃত্বের মধ্যে ‘বিশ্বাসের সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছে’।
নৌবাহিনী বিষয়ক সংবাদমাধ্যম নেভি টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান মোতায়েনের সময় রণতরীটিতে আত্মহত্যার একাধিক চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে। অ্যানাবেল লোমা নামে এক নারী জানান, সমুদ্রে অবস্থানের সময় বারবার বাড়তে থাকায় তার স্বামী সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি বলেন, তার স্বামী ভয় পাচ্ছেন। তিনি মনে করছেন, তাকে অসম্মানজনকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হতে পারে এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপে তার ১৩ বছরের সামরিক কর্মজীবন এভাবেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
আরেক নাবিকের স্ত্রী জানান, রণতরীতে পৃথক একটি ঘটনায় তার স্বামী এক সহকর্মীকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে ঠেকিয়েছেন। তিনি ওই ব্যক্তিকে ধরে জাহাজের ডেকে ফিরিয়ে আনেন।
মার্কিন কংগ্রেসের ক্যালিফোর্নিয়ার সদস্য মাইক লেভিনও রণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে ছত্রাকধরা গোসলখানা, নষ্ট শৌচাগার, কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা, দীর্ঘ সময় গরম পানির সংকট এবং খাবারের ক্ষেত্রে মাত্র আধা কাপ ভাত ও দুটি রুটির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি সাবান, দুর্গন্ধনাশক ও দাঁতের মাজনও পাওয়া যাচ্ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
কলোরাডোর কংগ্রেস সদস্য ও সাবেক সেনা সদস্য জেসন ক্রো বলেন, আব্রাহাম লিংকনে থাকা সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের ওপর চাপ সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাড়ছে।
গত ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে রণতরীটি। শুরুতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের পরিকল্পনা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শুরু হলে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ হাজারের বেশি সদস্যের এই রণতরীর নাবিক ও মেরিনরা এরপর মাত্র দুই দিন স্থলে কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন। ডিসেম্বর মাসে গুয়ামে এবং জুলাইয়ে ওমানে তারা স্থলে অবস্থান করেন। মোতায়েনের মেয়াদ মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চলমান যুদ্ধের কারণে তা কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে।
এর আগে এপ্রিলেও রণতরীটির জীবনযাত্রার মান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। নিম্নমানের ও সীমিত খাবারের ছবি প্রকাশের পাশাপাশি পানির সংকট, ছত্রাকধরা গোসলখানা এবং নষ্ট কাপড় ধোয়ার যন্ত্রের খবরও প্রকাশিত হয়। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব অভিযোগকে ‘ভুয়া খবর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এ বিষয়ে লেভিন বলেন, দেশের সেবা করার জন্য এসব নাবিক ও মেরিন যোগ দিয়েছেন। তাদের অন্তত গরম পানি, সচল শৌচাগার ও পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। হেগসেথ এসব ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে পারছেন না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার খবরের বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে জানতে চাওয়া হলে এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন নাবিক ও তাদের পরিবারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে এবং তাদের সহনশীলতা ও ত্যাগের জন্য নৌবাহিনী কৃতজ্ঞ।
তবে নৌবাহিনীর দাবি, কমান্ডের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী আব্রাহাম লিংকনে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বেড়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নাবিকদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নৌবাহিনীর অগ্রাধিকার বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, রণতরীতে ধর্মীয়, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পেশাজীবীরা রয়েছেন। এর মধ্যে মোতায়েনকালীন মানসিক স্থিতিস্থাপকতা পরামর্শদাতা ও ধর্মীয় পরামর্শদাতারাও রয়েছেন। যুদ্ধের কারণে প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেও রণতরী থেকে পাওয়া বর্তমান প্রতিবেদনে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নিয়মিত প্রাপ্যতার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।
সক্রিয় দায়িত্বে থাকা মার্কিন নৌসদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় সমুদ্রে মোতায়েন নাবিকদের ওপর বিশেষ ধরনের চাপের বিষয়টি উঠে আসে। এর মধ্যে উচ্চ শব্দ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি অন্যতম।
গবেষণায় মোতায়েন থাকা নাবিকদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক নাবিক সমুদ্রে মানসিক চাপ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। গবেষণাটিতে বলা হয়, নৌবাহিনীতেও আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্য হওয়ায় জাহাজে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ জরুরি।
/অ